চসিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির জরুরি সভা
জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ
স্টাফ রিপোর্টার
চসিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির জরুরি সভা
জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ....
চলতি বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ও সিডিএসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করবে এবং চলমান প্রকল্পসমূহের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
চট্টগ্রামের মহানগরীর সকল খাল ও পানি নিষ্কাশন নালাসমূহ সারা বছর সচল রাখাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয়ের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক ও সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। গত ৩০ এপ্রিল গঠিত হয় ১৯ সদস্যের এ কমিটি। সভায় চলমান বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনসংক্রান্ত চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো, খাল ও নালা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, প্রতিবন্ধকতা দ্রুত অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামছুল আলম, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম।
সভায় জানানো হয়, গত শনিবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নগরে মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৯ মিলিমিটার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার বিকাল তিনটা থেকে বুধবার বিকাল তিনটা পর্যন্ত এক দিনেই বৃষ্টিপাত হয় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার, এটাও একদিনে হওয়া সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। এর আগে ১৯৮৩ সালে ৪০৭ মিলিমিটার এবং ২০০৭ সালে ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ছিল। যেখানে ২০০৭ সালের সেই বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও বন্যায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১২৭ জন। এ প্রসঙ্গে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, আজকে জলাবদ্ধতার কাজ যদি না হতো তাহলে এই ১ হাজার ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পানিগুলো যাওয়া একটা কঠিন হয়ে যেত। জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে না নেওয়া গেলে এই পরিমাণ বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হত।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, অস্বাভাবিক মাত্রার টানা বৃষ্টিপাতের মধ্যেও খাল পুনঃখনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার চলমান কাজের কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে যেসব এলাকায় এখনো পানি জমে রয়েছে, সেসব স্থানের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, প্রত্যেকটা পয়েন্টে আমরা গিয়ে দেখছি, পানিটা রয়ে গেছে কেন। কারণ আমরা খুঁজতে চেষ্টা করছি। কারণ আমরা চাই একটা স্থায়ী সমাধান। তিনি বলেন, কাতালগঞ্জে একটা খালে ছাত্রলীগ–যুবলীগ আওয়ামী লীগের সময় ক্লাব করে ফেলেছে, দখল করেছে। চান্দগাঁও বামুন শাহী খাল, কৃষ্ণাখাল যেটাকে মরাখাল বলে সেখানে প্লট করে ফেলেছে, আবাসিক এলাকা করে ফেলেছে, গরুর খামার হয়ে গেছে। এগুলো আমাদেরকে উদ্ধার করতে হবে।
মেয়র বলেন, আমাদের অনেক ড্রেন দখল হয়ে গেছে। গত সরকারের আমলে ড্রেনগুলোকে সিমেন্টিং করে ফুটপাত বানিয়েছে, সেখানে পানি যাওয়ার কোনো ছিদ্র পর্যন্ত নেই। রাস্তার মধ্যে পানি কিন্তু ড্রেনের মধ্যে পানি নেই। অনেক বঙ কালভার্ট ধ্বংস হয়ে গেছে। পানি যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি জলাবদ্ধ এলাকার কারণ অনুসন্ধান করছি। কোথায় খাল বন্ধ হয়েছে, কোথায় ড্রেন দখল হয়েছে, কোথায় বঙ কালভার্ট নষ্ট হয়েছে সবকিছু শনাক্ত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, দুই নম্বর গেটসহ যেসব এলাকা আগে নিয়মিত পানিতে তলিয়ে যেত, সেখানে এখন দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। অবশিষ্ট সমস্যাগুলোও ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে।
সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে আরও ৪০টি খাল উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধারের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরীর জলাবদ্ধতা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা অসম্ভব কোনো লক্ষ্য নয়। সমন্বিত পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, খাল পুনরুদ্ধার এবং জনগণের সহযোগিতা পেলে আমরা ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।
ডা. শাহাদাত বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, রেড ক্রিসেন্ট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একযোগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে কাজ করছে।
নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যত্রতত্র প্লাস্টিক, পলিথিন ও বর্জ্য ফেলে আমরা নিজেরাই ড্রেন ও খাল বন্ধ করে দিচ্ছি। সিভিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের দায়িত্ব হলো মাঠে। আমি আশা করবো এখন থেকে এই জাতীয় দুর্যোগ যখন হবে আপনারা মেয়রকেন্দ্রিক, সিডিএ চেয়ারম্যানকেন্দ্রিক ছুটাছুটি না করে প্রত্যেকটা পয়েন্টে যাবেন।
প্রকৌশলী বেলায়েত বলেন, লক্ষ্য পূরণে আপনাদের সকলের সহযোগিতা লাগবে। আর কেউ এ কথাটি বলবেন না এটা সিটি কর্পোরেশনের, এটা সিডিএর, এটা গণপূর্তের। অতীতের একে অপরের দোষারোপের রাজনীতি থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামছুল আলম বলেন, সামপ্রতিক রেকর্ড বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা যাতে সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করেছি। ফলে, যখনই বৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য থেমেছে দ্রুত বৃষ্টির পানি নেমে গেছে। এটা সম্ভব হয়েছে দখলকৃত খাল–নালা উচ্ছেদ করে জলপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে অভিযান পরিচালনার জন্য। যেসব জায়গায় এখনো উচ্ছেদের প্রয়োজন আছে সেগুলো উচ্ছেদ করে, রেগুলেটরগুলো ঠিকমতো কাজে লাগালে, অসমাপ্ত কাজ শেষ হলে নগরীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলার সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে।
প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, এবার যে অতিবৃষ্টি হয়েছে আমরা মোকাবিলা করতে পেরেছি কারণ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটা টিম কিন্তু সক্রিয় ছিল মাঠে।
সভায় অন্যান্যের মাঝে বক্তব্য রাখেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া, ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী, এডিসি মো. কামরুজ্জামান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) মো. জামিলুর রহমান, চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম মামুনুল বাশরী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আহমদ মঈনুদ্দিন, চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগ–১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাঈদ, আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আবদুর রহমান খান, ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের খাল ও জলাবদ্ধতা বিষয়ক উপদেষ্টা শাহরিয়ার খালেদ, সাংবাদিক জাহিদুল করিম কচি এবং সিটি রেড ক্রিসেন্টের সেক্রেটারি গোলাম বাকী।