
হকারমুক্ত দেশ চাই! কিন্তু বেকারমুক্ত নয়!!
মনোয়ার হোসেন রতন
বাহ্! কী চমৎকার সভ্যতা আমাদের!
আমরা হকারমুক্ত শহর চাই, দখলমুক্ত ফুটপাত চাই, ঝকঝকে রাস্তা চাই। চাই হাঁটতে হাঁটতে নাগরিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। শুধু চাই না-যে মানুষটি ফুটপাতে বসে দুটো পয়সা রোজগার করে সংসার চালান, তাঁর ঘরে চুলা জ্বলছে কি না, সেই খবরটুকু রাখতে।
ফুটপাত দখলমুক্ত হোক-অবশ্যই। পথচারীর হাঁটার অধিকার আছে, প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের অধিকার আছে, নগরকে শৃঙ্খলিত রাখারও প্রয়োজন আছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়-ফুটপাত থেকে একজন হকারকে সরিয়ে দেওয়ার আগে তাঁর জীবিকা নির্বাহের পথটি কোথায়, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
উচ্ছেদ করা সহজ। পুনর্বাসন কঠিন।
নোটিশ দেওয়া সহজ। কর্মসংস্থান তৈরি কঠিন।
মাইক বাজিয়ে অভিযান চালানো সহজ। একটি বেকার মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়া কঠিন।
তাই আমরা সহজ কাজটাই করি। গরিব মানুষটিকে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ বলে ঘোষণা করি। তারপর উন্নয়নের ছবি তুলি, সভা করি, বাহবা নিই। শুধু ছবির বাইরে পড়ে থাকে সেই মানুষটি—যাঁর পুঁজি কয়েক হাজার টাকা, সম্বল একটি ঠেলাগাড়ি, আর বুকভরা বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দেশে শুধু ফুটপাতের হকাররাই কি বেকারত্বের প্রতীক?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি হাতে নিয়ে কত তরুণ আজ চাকরির দরজায় দরজায় ঘুরছেন! কেউ বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে নিতে জীবনের মূল্যবান সময় হারাচ্ছেন, কেউ চাকরির পরীক্ষার ফি জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেউ দিনের পর দিন সাক্ষাৎকার দিয়ে ফিরছেন শূন্য হাতে। কারও বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, কারও পরিবারের সঞ্চয় শেষ হচ্ছে, কারও চোখের স্বপ্ন নিভে যাচ্ছে নীরবে।
একজন শিক্ষিত তরুণ যখন নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না, তখন তাঁর ডিগ্রিটি কি কেবল দেয়ালে টাঙিয়ে রাখার সনদ? যে শিক্ষা তাঁকে আত্মনির্ভরশীল করার কথা, সেই শিক্ষার শেষে যদি অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘশ্বাস অপেক্ষা করে, তবে সেই সংকটের দায় কি শুধু তাঁর নিজের?
একদিকে শিক্ষিত বেকার তরুণের হাতে কাজ নেই, অন্যদিকে অল্প পুঁজির হকার ফুটপাতে বসে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একজন চাকরির আশায় ঘুরছেন, অন্যজন সামান্য আয়ের আশায় রোদ-বৃষ্টিতে বসে আছেন। দুজনের পথ আলাদা, কিন্তু অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা কি খুব আলাদা?
একজনের হাতে শিক্ষার সনদ, অন্যজনের হাতে পণ্য—দুজনেরই প্রয়োজন সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার।
মাননীয় নীতিনির্ধারকগণ, একটি প্রশ্ন করি—হকার কি শখ করে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, মানুষের ধমক খেয়ে ফুটপাতে বসেন? নাকি আমাদের কর্মসংস্থানের বাস্তবতা তাঁকে সেখানে ঠেলে দিয়েছে?
আর যে শিক্ষিত তরুণটি বছরের পর বছর পড়াশোনা করে চাকরি পাচ্ছেন না, তাঁর ভবিষ্যৎ কোন পরিকল্পনায় লেখা আছে? শুধু ডিগ্রি অর্জনের পরামর্শ দিলেই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ? শিক্ষা, দক্ষতা, শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার দায়িত্ব কার?
অবশ্যই সব হকার নির্দোষ নন। ফুটপাত দখল, যানজট সৃষ্টি কিংবা পথচারীর চলাচলে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। কিন্তু অপরাধের বিচার আর দারিদ্র্যের শাস্তি এক বিষয় নয়। আইন সবার জন্য সমান হোক, ব্যবস্থা হোক ন্যায্য, আর বিকল্প জীবিকার সুযোগও থাকুক।
নীতিনির্ধারকদের কাছে তাই আমাদের দাবি—শুধু উচ্ছেদ নয়, পরিকল্পিত সমাধান চাই। নির্দিষ্ট স্থানে হকারদের জন্য বাজার ও বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলুন, স্বচ্ছ নিয়মে বরাদ্দ দিন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ান। পাশাপাশি শিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য যোগ্যতাভিত্তিক চাকরি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং বৈষম্যহীন নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিন।
ফুটপাত পথচারীর থাকুক, হকারও ফিরে পাক সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার। শিক্ষিত তরুণের ডিগ্রিও অর্থবহ হোক, তাঁর মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হোক।
কারণ, একটি শহর কতটা উন্নত, তা শুধু তার ফুটপাতের পরিচ্ছন্নতায় মাপা যায় না; মাপতে হয় সেই শহরের দরিদ্রতম মানুষটির জীবন কতটা নিরাপদ, তা দিয়েও। আর একটি রাষ্ট্র কতটা সফল, তা শুধু তার শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিয়ে নয়—তাদের মেধা ও শ্রম কাজে লাগানোর সুযোগ দিয়েও বিচার করতে হয়।
আমরা হকারমুক্ত ফুটপাত চাই—কিন্তু কর্মহীন মানুষে ভরা রাষ্ট্র চাই না। আমরা দখলমুক্ত নগর চাই—কিন্তু জীবিকার পথ বন্ধ করে দেওয়া উন্নয়ন চাই না।
রাষ্ট্র যদি মানুষের কাছ থেকে বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নেয়, তবে তার কাছে প্রশ্ন থাকবেই—বিকল্প কী দিলেন?
মনে রাখবেন, পেটের ক্ষুধা কোনো উচ্ছেদ অভিযানের বিজ্ঞপ্তি বোঝে না। সংসারের অভাব সরকারি আদেশে থেমে থাকে না। আর শিক্ষিত বেকারের হাতে থাকা সনদও নিজে থেকে তাঁর পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেয় না।
আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে ফুটপাত থাকবে পথচারীর, বাজার থাকবে সুশৃঙ্খল, আর প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষের থাকবে সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ। যেখানে শিক্ষিত তরুণকে চাকরির আশায় বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় কাটাতে হবে না, আর একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রতিনিয়ত উচ্ছেদের আতঙ্কে থাকতে হবে না।
উন্নয়নের নামে মানুষকে সরিয়ে দেবেন না; মানুষকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়ন গড়ুন।
কারণ, ফুটপাত পরিষ্কার করলেই শহর সুন্দর হয়; কিন্তু মানুষের চোখের জল মুছতে পারলেই রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়।